স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা

স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা

লুৎফর রহমান রিটন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কল্যাণে আশির দশকের শেষান্তে ঢাকার মতিঝিল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে ছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে একবার প্রকাশ্যে ‘সরি’ বলতে হয়েছিলো আমাকে। ঐ স্কুলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জাতীয়ভিত্তিক মানসিক উৎকর্ষ কার্যক্রম চালু ছিলো। কার্যক্রমের মহান সৈনিকরা এক কাণ্ড করে বসলো। তাদের ভ্রান্তির কারণে ওই স্কুলের সবচে ভালো পড়ুয়া মেয়েটি সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পুরস্কারটি পেয়েও পায়নি। অর্থাৎ কিনা ভুল করে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ওর নাম ঘোষণাই করা হয়নি। এহেন ভ্রান্তি মোচনের দায়িত্ব পড়লো আমার ঘাড়ে। অনেকটা সম্রাটের মতো সায়ীদ স্যার তাঁর বিখ্যাত অমলিন হাসি উপহার দিলেন তাঁর ত্রয়োদশ পুত্রবৎ লুৎফর রহমান রিটনের দিকে- ‘যাও হে বৎস, ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক পুরস্কারটি যথাহস্তে অর্পণ করিয়া আইসো।’

আমার তো অবস্থা খারাপ। একী কাণ্ড! কোথাকার ওয়াটার কোথায় ল্যান্ড করছে? ভুল করলো কে আর ক্ষমা চাইবে কে? কিন্তু সম্রাটের আদেশ বলে কথা। সায়ীদ স্যারের ভাষায়, আমি হচ্ছি সম্রাটের সেই ত্রয়োদশ পুত্র, সম্রাট বিভিন্ন রণক্ষেত্রে নিজে না গিয়ে যাকে প্রেরণ করেন নিশ্চিন্তে। ত্রয়োদশ পুত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ মানেই হচ্ছে- ‘যাও, কার্য সম্পাদন করো।’

কেন্দ্র পরিচালিত স্কুলভিত্তিক সেই কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ছিলো প্রীতিভাজন গোলাম মোর্তোজা (পরবর্তীতে সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং ২০০০-এর দুর্দান্ত প্রতিবেদক এবং শাহাদত চৌধুরীর মৃত্যুর পর ২০০০-এর সম্পাদক, সাপ্তাহিক-এর সম্পাদক, হালের টিভির টকশোখ্যাত)। মোর্তোজা আমাকে বুঝিয়ে দিলো ব্যাপারটা- ‘রিটন ভাই, আগামীকাল সকাল সাতটার মধ্যে মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসতে হবে আপনাকে। পুরস্কারের বই এবং সার্টিফিকেটসহ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে আপনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবো আমি। স্কুলের য়্যাসেমব্লিতে ঘটবে ঘটনাটা।’

শুনে আমার তো রীতিমতো জ্বর এসে গেলো। কারণ আমার সকাল হয় ন’টায়। আমার সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয় দু’টোই প্রলম্বিত এবং বিলম্বিত। অতো সকালে আমি ঘুম থেকে জাগবো কীভাবে! ভোর ছ’টায় উঠতে হবে এই টেনশনে সারারাত প্রায় জেগেই কাটানো গেলো। সকালে লাল হোন্ডায় চেপে ঘুম ঘুলুঢুলু চোখে ঠিক ঠিক সময়মতো হাজির হয়ে গেলাম জায়গা মতো। দেখি, মোর্তোজা জন্ডিস রোগীর মতো ফ্যাকাসে মুখে পুরস্কারের একগাদা বই আর সার্টিফিকেট হাতে অপেক্ষমাণ।

য়্যাসেমব্লিতে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ইয়্যুনিফর্ম পরা একঝাঁক মেয়ে। প্রধান শিক্ষক আপা মাইকে লুৎফর রহমান রিটন নামক এক অধম ছড়াকারের নাম ঘোষণা করলেন। মেয়েগুলো তো অবাক। য়্যাসেমব্লিতে ছড়াকার? কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অতিথি নারায়ণ আমি, সম্রাট আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ত্রয়োদশ পুত্রসাজে সজ্জিত আমি, লজ্জিত ও অতিশয় বিনীত ভঙ্গিতে ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক ঘটনার বর্ণনা করে পুরস্কারপ্রাপ্ত মেয়েটির নাম ঘোষণা করলাম। তুমুল হাস্য আর বিপুল করতালির মধ্যে বিজয়ী অভিভূত মেয়েটি দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে গ্রহণ করলো তার বিজয় সম্ভার।

এক তরুণী শিক্ষক এগিয়ে এলেন। সংক্ষিপ্ত অথচ চমৎকার বক্তব্য রাখলেন তিনি। বললেন, ‘ক্ষমা চাওয়াটা যে কতো মহৎ হতে পারে, সুন্দর হতে পারে, আজকের ঘটনা তারই প্রমাণ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নামের প্রতিষ্ঠানটির সুনাম শুনেছি এতোকাল। আজ বুঝলাম, কেনো এই প্রতিষ্ঠান অনন্য। ভুল মানুষেরই হয়। ভুল হলে পর ক্ষমা প্রার্থনাও যে কতোটা শৈল্পিক এবং মাধুর্যময় হতে পারে আজ আমরা সেটাই শিখলাম। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেলো। কারণ তিনি সাধারণ কোনো কর্মীর মারফৎ ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। একজন সম্মানিত ছড়াকারকে পাঠিয়েছেন। এতে করে শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো ছড়াকারের প্রতিও। এসো আমরা হাততালি দিয়ে তাঁদের সম্মান জানাই।’

এভাবেই সম্রাটের অদৃশ্য আসনে যুক্ত হয়েছিলো আরো একটি উজ্জ্বল দ্যুতিময় হীরকখণ্ড এবং তাঁর ত্রয়োদশ পুত্রের অদৃশ্য মুকুটে শোভিত হয়েছিলো আরো একটি বর্ণিল পালক।

২. ড্রাইভার, সারেং, পাইলট কিংবা মাঝি

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কে? আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? তিনি আমার কে হন, আমিই বা তাঁর কী হই? মাঝে মধ্যেই আচমকা এ রকম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। সন্দেহ নেই, অত্যন্ত সরল প্রশ্ন। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর ‘এককথায় প্রকাশ করা’ কঠিন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘মানসিক উৎকর্ষ কার্যক্রম’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে ঢাকার উল্লেখযোগ্য প্রায় সবক’টি স্কুলে আমাকে যেতে হতো। যেতে হতো ঢাকার বাইরেও। কখনো কিশোরগঞ্জে, কখনো রংপুরে, আবার কখনো পিরোজপুরে। সর্বত্রই এরকম বেকায়দা প্রশ্ন করে বসতো স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়া কিশোর-কিশোরী বন্ধুরা। তাঁদের শিক্ষকরা। অভিভাবকরা। ওরা জানতে চাইতো কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি শিক্ষক-ছাত্রের নাকি সহকর্মীর? গুরু-শিষ্যের নাকি সহযোদ্ধার? পিতা-পুত্রের নাকি অসম বয়েসী বন্ধুর? আমি বলতাম—সব ক’টাই।

আমি ঢাকা কলেজে সায়ীদ স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। সেই হিশেবে আমাদের সম্পর্কটা তো শিক্ষক ছাত্রেরই। গুরু-শিষ্যেরই। কেন্দ্রে একসঙ্গে দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী কাজ করেছি। সম্পর্কটা তো সহকর্মীরও। সমাজে আলোকিত প্রজন্মের প্রত্যাশায়, আলোকিত মানুষের প্রত্যাশায় আমরা লড়াই করছি। সুতরাং সম্পর্কটা তো সহযোদ্ধারও। শিক্ষক বা গুরুস্থানীয়রা স্নেহ-মমতার এবং সোহাগ-শাসনের অধিকার সম্পন্ন বিধায় এমনিতেই তাঁরা পিতার আসনেই থাকেন। সুতরাং আমাদের সম্পর্কটা তো পিতা-পুত্রেরও। বয়েসের তথাকথিত গোড়ামিপূর্ণ সমস্ত নিষেধ অগ্রাহ্য করে তিনি আমার সঙ্গে অবলীলায় গড়ে তুলেছেন এমন চমৎকার একটি সম্পর্ক যে সম্পর্কটির আভিধানিক নাম ‘বন্ধু’। সুতরাং তিনি আমার অসমবয়েসী বন্ধুও। বর্ণিত সম্পর্কগুলোর একটা প্যাকেজ নাম- ‘আলোর পথের যাত্রী’। হ্যাঁ। আলোর পথের যাত্রী আমরা।

দূর গন্তব্যে যেতে হলে সময় মতো সঠিক বাহনটিতে চেপে বসার জন্যে প্রথমেই দাঁড়াতে হয় প্লাটফর্মে। প্লাটফর্ম থেকে কিছুক্ষণ পরপর একেকটা বাহন একেক গন্তব্যে ছুটে যায় হুইশেল দিতে দিতে। অপেক্ষমাণ যাত্রীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর স্বপ্নটিকে বাস্তবায়নের জন্যেই প্লাটফর্মে এসে শামিল হন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে আমার ওরকম একটি প্লাটফর্ম বলে মনে হয়। আমাদের আগামী প্রজন্মকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবার জন্যেই নির্মিত হয়েছে এই প্লাটফর্ম। সারাদেশে দু’তিনশ প্লাটফর্মে যে যাত্রীরা এসে জড়ো হয়, বয়সে তারা কিশোর-তরুণ। উদ্দীপ্ত, শাণিত, দীপ্র এবং স্বপ্নবান। প্লাটফর্ম থেকে অবিরাম ছুটে চলা বাহনগুলোর চালক- অর্থাৎ কিনা ড্রাইভার, সারেং, পাইলট কিংবা মাঝিটি হচ্ছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমরা কতিপয় তাঁর হেলপার। টিকিট চেকিং, ইঞ্জিনে পানি ঢালা, এবং যাত্রীদের সঠিক আসনে বসানোর মতো কাজগুলো আমাদের। গুরুর দেয়া গুরুদায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট আমরা।

অতীতে এভাবেই ব্যাখ্যা করতাম আমি আমাদের সম্পর্কটিকে।

৩. আমাদের তুমুল তারুণ্যের উদ্দাম দিনগুলো

আমাদের স্বপ্নের কেন্দ্রটির নাম ছিলো ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। আমরা আমাদের তুমুল তারুণ্যের উদ্দাম দিনগুলো কাটিয়েছি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। আমি আমার জীবনের সবচে উজ্জ্বল বর্ণাঢ্য চকচকে দিনগুলোর কথা বলতে গেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথাই বলি সবার আগে। একটা সময় ছিলো যখন আমার সকাল-সন্ধ্যা দিন-রাত্রির পুরোটাই দখল করে নিয়েছিলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়- আমার জীবনটাই ছিলো কেন্দ্র কেন্দ্রীক।

প্রতিদিন খুব সকাল সকাল বাংলামোটর চলে আসতাম। বাড়ি ফিরতাম গভীর রাতে। একদিন কেন্দ্রে না এলে জীবনটা মনে হতো অর্থহীন, অপূর্ণ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নাম-দু’টির সঙ্গে আমার ছিলো গভীর সখ্য। এই নাম-দু’টি আমার আত্মার আত্মীয়। আমার বর্ণালী তারুণ্যের স্বর্ণালী স্মৃতির আলোর ঝালর এই নাম দুটি। একটিকে আরেকটি থেকে আলাদা করতে পারি না। একটিকে অন্যটি থেকে সরিয়ে নিতে পারি না।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যদি হয় স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু তবে সায়ীদ স্যার হচ্ছেন স্বপ্নের ফেরিঅলা। পৃথিবীতে মানুষ কতো কিছুই না বিক্রি করেন। কেউ বিক্রি করেন সোনা-রূপা-হীরক-মুক্তা। কেউ বিক্রি করেন চাল-ডাল-তেল-লবণ-মরিচ। কিন্তু সায়ীদ স্যার বিক্রি করেন স্বপ্ন। স্বপ্ন বিক্রি করে আবার তিনি স্বপ্নকেই কেনেন সমান দামে। স্বপ্ন বিকি-কিনিতে সায়ীদ স্যার বিরামহীন, ক্লান্তিহীন। স্বপ্ন বিকি-কিনির হাটে সায়ীদ স্যার এক অবাক ফেরিঅলা। এক আজব ফেরিঅলা। নিজের স্বপ্ন বিক্রি করতে এসে নিজের সেই স্বপ্নকে অন্যের স্বপ্নে পরিণত করে ফেলেছেন স্যার। স্যারের একক স্বপ্ন এখন আমাদের সম্মিলিত স্বপ্ন। স্যারের একক স্বপ্ন এখন আলোকসন্ধানী একটি জাতির স্বপ্ন।

৪. নিস্তরঙ্গ শুনশান মফস্বলগন্ধী সেই গলিতে

একটু পেছনে ফিরে তাকাই। বাংলামোটর মোড়ের পেট্রোলপাম্প লাগোয়া সরু গলিটার মুখেই একটা সাইনবোর্ড। সেই সাইনবোর্ডে হালকা ইয়েলো অকার রঙে ফ্রি হ্যান্ডে লেখা ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। লেখার শুরুতে একটা লোগো। সেই লোগোতে একটা বই এবং আলোর একটা শিখা। লোগোটা এঁকেছিলো আমার বন্ধু তখনকার তরুণ আঁকিয়ে এখনকার বিখ্যাত শিল্পী মাসুক হেলাল। ফ্রি হ্যান্ড লেটারিংটা বরেণ্য শিল্পী হাশেম খানের।

এক ধরনের নিস্তরঙ্গ শুনশান মফস্বলগন্ধী সেই গলিতে প্রবেশ করে খানিকটা এগোলেই হাতের ডান দিকে বৃক্ষ এবং পাতার ঘনসবুজ আর গাঢ়খয়েরি আলো-আঁধারিতে কী বিপুল গৌরব আর অনিঃশেষ মমতা নিয়ে দাঁড়িয়ে দেড়তলা সাইজের দোতলা একটি ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির মূল ফটক পেরোনো মাত্র ডানপাশের লন-এর সবুজ দুর্বাঘাসের মখমল কার্পেট স্বাগত জানাবে নিঃশব্দে। অতঃপর অজস্র আমের মুকুলের মাতাল করা গন্ধ কিংবা বেলিফুলের উদাস করা সুবাস অথবা কামিনী ফুলের সুতীব্র ঘ্রাণ এসে জড়িয়ে ধরবে—এসো বন্ধু এসো।

এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করেই আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই বাড়িটিতেই ‘স্বপ্নের ফেরিঅলা’ থাকেন। এখানে বসেই তিনি স্বপ্ন বিক্রি করেন। তাঁর ক্রেতারা সবাই বয়েসে নবীন। এরা তরুণ কিন্তু সংযত। ক্ষীণদেহী কিন্তু বলিষ্ঠ। একটা বিস্ফোরণ ঘটাতে টগবগ করছে সারাক্ষণ, কিন্তু উদ্ধত নয় এদের কেউই। এই তরুণদের সামনে মামুলি শাদা পাজামা আর খদ্দরের সাধারণ পাঞ্জাবি পরা অসম্ভব দ্যুতিময় চোখ আর মুগ্ধতায় ভাসিয়ে নেয়া হিরণ্ময় কণ্ঠস্বরের একজন ফেরিঅলা অনর্গল বলে চলেছেন তাঁর স্বপ্নের কথা। তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমাদের বইপ্রেমী তরুণদের একালের সক্রেটিস। তরুণদের মস্তিষ্কে তিনি বিরামহীন অক্লান্ত রোপন করে চলেন সেই সম্মোহনী মন্ত্র— ‘মানুষ তার আশার সমান বড়’। আলোকিত মানুষ আর সম্পন্ন মানুষের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে তিলতিল যত্নে গড়ে তুলেছেন তিনি দেশের একমাত্র আলোর ইশকুল—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।

আমাদের চারপাশে যখন ভণ্ড-প্রতারক-লোভী-আত্মকেন্দ্রিক-মূর্খ একটি লুটেরা শ্রেণী বিকশিত হচ্ছিলো আবিশ্বাস্য দ্রুততায়, এবং কূপমণ্ডুক রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন তাদের অন্ধ অনুসারীদের বিপুল সমর্থন নিয়ে নিজেদের সর্বগ্রাসী তমসাচ্ছন্ন থাবাটির বিস্তার ঘটিয়ে যাচ্ছিলো নির্বিঘ্নে, তখন একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এগিয়ে আসেন অতিশয় ক্ষুদ্র একটি আলোকশিখা হাতে। শিল্পী মাসুক হেলাল কেন্দ্রের লোগোতে সেই ক্ষুদ্র কিন্তু অবিনাশী আলোক শিখাটিকেই মূর্ত করে তুলেছেন।

বাংলামোটরের ছোট্ট সেই বাড়ির লবিতে-সিঁড়িতে-অডিটোরিয়ামে-লাইব্রেরিতে-ছাদে সর্বত্র একদল কিশোর-কিশোরী আর তরুণ-তরুণীর অস্থির চঞ্চল পদক্ষেপ আর তাদের অফুরন্ত কলকাকলি সারাক্ষণ একটা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ঝলমলে আবহ তৈরি করে রাখতো। এইখানে এলে চরম নৈরাশ্যবাদীরও চিত্তচাঞ্চল্য ঘটতো। সবকিছুতে হতাশ সেই নৈরাশ্যবাদীটি নিতান্ত অনিচ্ছায় অনুভব করতে বাধ্য হতো যে— কিছু একটা হচ্ছে এখানে। একটা কিছু ঘটছে এখানে। কিন্তু কী সেটা?

এই প্রশ্নের উত্তরটা বেশ বিমূর্ত। খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায় যে একটা কিছু ঘটছে। ঘটেই চলেছে। সেই একটা কিছুর প্রভাবে দেশের নানান প্রান্তে নানান সেক্টরে আমরা কিছু আলোকিত মানুষ পাচ্ছি। সম্পন্ন মানুষ পাচ্ছি। যাঁদের সম্মিলিত জাদুর পরশে একদিন ফুটে উঠবে আলো। ঘুচে যাবে অন্ধকার। পালটে যাবে দেশ। পাল্টাবে দেশের মানুষের নিয়তি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অন্ধকারে আলো ফোটানোর কাজটি করে যাচ্ছেন নিরন্তর। ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ নামে বই লিখলেও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আসলে ‘শষ্যশ্যামল ফসল ভরা মাঠের ডালি’ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।

৫. ‘আমি তোমারই সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ...’

আমি, আমরা আমাদের যৌবনের সবচে উজ্জ্বল সময়টা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে দিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে বলি— ‘আমি তোমারই সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ।’ হ্যাঁ, আমাদের প্রাণ বাঁধাই ছিলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে। কোনো শুক্র-শনি ছিলো না। ঝড়-বৃষ্টি-পিচগলা খরতাপ-বরফঠান্ডা শৈত্যপ্রবাহ-অসহ্য লোডশেডিং কিছুই আটকাতে পারতো না আমাদের। আমার, আমাদের কতিপয় তরুণের জীবনটাই ছিলো কেন্দ্রমুখী এবং কেন্দ্র কেন্দ্রিক। কিন্তু কেনো? কিসের টানে আমরা প্রতিদিন ছুটে গেছি বাংলা মোটরের সেই ছোট্ট বাড়িটাতে? অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সম্মোহনী আকর্ষণ ছাড়াও আরো কিছু একটা ছিলো সেখানে। উজ্জ্বল উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত একদল মুক্তোখচিত চকচকে ঝকঝকে ছেলেমেয়ে ছাড়াও কিছু একটা ছিলো সেখানে। সারা পৃথিবীর সেরা বইগুলোর সুবিপুল সমাহার ছাড়াও কিছু একটা ছিলো সেখানে।

সেই কিছু একটার আকর্ষণে এখন, বর্তমানের স্বপ্নবান তরুণরাও ছুটছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দিকে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের দিকে। আমি জানি আগামীতেও ছুটবে আরেকটি দল। প্রজন্মের এই রিলে রেস চলতেই থাকবে।

৬. কিশোর তরুণদের উৎকর্ষধর্মী মাসিক ‘আসন্ন’-এর যাত্রা শুরু

১৯৮৮ সালে কিশোর তরুণদের উৎকর্ষধর্মী একটি মাসিক পত্রিকার পরিকল্পনা করলেন সায়ীদ স্যার। নাম ঠিক করলেন ‘আসন্ন’। আমাকে সম্পাদকের আসনে বসিয়ে নিজে থাকলেন উপদেষ্টা পদে। ‘আসন্ন’র জন্যে তিনটি লোগো এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী আফজাল হোসেন। সায়ীদ স্যারের তা পছন্দ হলো না। অতঃপর হাশেম খান এঁকে দিয়েছিলেন ‘আসন্ন’র লোগোটি। ‘আসন্ন’র ইলাস্ট্রেশন করতেন শিল্পী সৈয়দ এনায়েত হোসেন।

সায়ীদ স্যারের সঙ্গে ‘আসন্ন’ প্রকাশের বিষয়টি পাকাপাকি হবার পর আমি আমীরুল ইসলামকে আসন্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাইলাম। কিন্তু স্যার বললেন— এখন তো আর সম্ভব না। ট্রাস্টি বোর্ডের মিটিং-এ সবকিছু ফাইনাল হয়ে গেছে। তোমার স্যালারি নির্ধারিত হয়েছে মাসিক আড়াই হাজার টাকা। ওকে আনতে চাইলে আনতে পারো কিন্তু ওর জন্যে বাড়তি টাকার বরাদ্দ করা যাবে না।

আমি স্যারকে বললাম— আমি আমার সহকারী সম্পাদক হিশেবে ওকে চাই। ও খুব মেধাবী স্যার। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো একটা প্রতিষ্ঠানে আমীরুলের মতো প্রতিভাবান একটা ছেলে যুক্ত হলে খুবই ভালো হবে। কেন্দ্র তাতে লাভবান হবে। আর টাকার সমস্যাটা অন্যভাবেও আমরা সমাধান করতে পারি।

স্যার বললেন— কী ভাবে?

আমি বললাম— আমার জন্যে বরাদ্দ আড়াই হাজার থেকে এক হাজার ওকে দিয়ে দ্যান স্যার। আমি পনেরো শ-ই নেবো।

আমার কথায় খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন স্যার। এবং পরবর্তীতে আমার প্রস্তাব মোতাবেক ব্যবস্থাটা হয়েছিলো। আমীরুল পেতো এক হাজার আর আমি পেতাম দেড় হাজার। এই বিষয়টা কেন্দ্রের তৎকালীন সমন্বয়কারী মাযহার ছাড়া আর কেউ জানে না। (এই লেখাটি কোনোদিন চোখে পড়লে আমীরুলও জানবে) আমীরুল সম্পর্কে সায়ীদ স্যারকে বলা আমার কথাটা পরবর্তীতে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে আমীরুলের সম্পৃক্তি কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করেছিলো। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিশেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যাত্রারম্ভ হয়েছিলো ‘রিটন-আমীরুল-মাযহার’ ত্রয়ীর প্রোডাকশন স্কিল-এর সমন্বয়ে। মাথার ওপরে অভিভাবক হিশেবে, লিডার হিশেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তো ছিলেনই।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিশেবে একুশের বইমেলায় প্রথমবার অংশ নিয়েই ক্রেতা-পাঠকদের বিপুল ভালোবাসা অর্জন করে নিয়েছিলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত প্রথম দিককার অসাধারণ বইগুলোর দৃষ্টিনন্দন রুচিস্নিগ্ধ প্রচ্ছদগুলো করেছিলেন শিল্পী হাশেম খান, মাসুক হেলাল এবং ইউসুফ হাসান। পরবর্তীতে ধ্রুব এষ।

৭. স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নামের আমাদের স্বপ্নের সেই বাড়িটা এখন আর আগের চেহারায় নেই। স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা এখন অতি আধুনিক মহাজাঁকজমকপূর্ণ বহুতল ভবন হিশেবে আকাশ ছুঁতে চাইছে। কেন্দ্রের সেই আমগাছটি এখন আর সহস্রমুকুলের গন্ধে কাউকে মাতাল করে তোলে না।

ইস্ফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনটিও নেই আর। অতিউঁচু ভবনের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে আটপৌরে আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ কেন্দ্রের সেই পলেস্তারা খসেপরা পুরনো হার্দিক উন্মুক্ত ছাদটিও। কেন্দ্রের মূল ফটকে প্রবেশমুখের সবুজ দুর্বাঘাসের কার্পেটটিও উধাও হয়েছে। কামিনী ফুলের তীব্র ঘ্রাণের বদলে কেন্দ্রে আসা অতিথিকে এখন জড়িয়ে ধরে বেলজিয়ামের মূল্যবান কাঁচের চাকচিক্যময় অচেনা এক রৌদ্রের প্রতিচ্ছায়া।

বাংলামোটরের সেই জাদুমাখা গলির ভেতরে প্রবেশ করলেই আমি কেমন নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। আমার বুকটা হুহু করে ওঠে। চোখ দু’টো জলে ভরে যায়। অইতো আমার প্রিয় আঙিনা। আমার যৌবনের বহু আনন্দ-বেদনার ছায়াসঙ্গী। আমার সৃজনশীলতার অপরূপ ক্যানভাস। ওইখানে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নামের এক সপ্রতিভ জাদুকর একদা অপরূপ কিছু ম্যাজিক দেখিয়ে বিস্মিত করেছিলেন আমাকেও! প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর সেই ম্যাজিশিয়ানের পাঞ্জাবির পকেটে অদ্ভুৎ একটা বাঁশি আছে। সেই বাঁশির সিম্ফনিতে আছে অপূর্ব এক হৃদয়হরা সম্মোহনী সুধা। সেই সুধা একদা সম্মোহিত করেছিলো আমাকেও!

এখনকার তরুণরাও ছুটছে সেই ম্যাজিশিয়ানের বাঁশির মূর্ছনায় একই সম্মোহনে একই মুগ্ধতায়।

৮. ফোটাও তুমি আলোর কুসুম

আমাদের স্বপ্নের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার যৌবনদীপ্ত চল্লিশ বছর অতিক্রম করছে! বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দিন দিন নতুন যৌবনের সঞ্জীবনী সুধায় দীপ্র-ক্ষিপ্র আর অপরূপ হয়ে উঠছে! বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে আমাদের যৌবনের নায়ক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও নব যৌবনের বিপুল উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছেন। চিরসবুজ এই মানুষটি বার্ধ্যক্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর পরশে সারাদেশে অবিরাম ফুটছে বর্ণালী সব আলোর কুসুম। সেই কুসুমের সৌরভে আর গৌরবে সুরভিত হয়ে উঠছে সারাদেশ।

স্বপ্নের ফেরিঅলা, আলোর পথের দুর্দান্ত ম্যাজিশিয়ান, জাদুর বাঁশির অলৌকিক বাঁশুরিয়া, আমার শিক্ষক এবং বন্ধু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে চল্লিশ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে— আটলান্টিকের এপার থেকে, বারো হাজার তিনশ কিলোমিটার দূরের দেশ বরফপ্লাবিত কানাডা থেকে একসমুদ্র ভালোবাসা।

অটোয়া ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

[ক্যাপশন/ ১৯৮৮ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সকালের আনুষ্ঠানিকতার একটি দৃশ্যে বাঁদিক থেকে ইমদাদুল হক মিলন, হাশেম খান, লুৎফর রহমান রিটন, শার্লি রহমান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, খায়রুল আলম সবুজ, আমীরুল ইসলাম, আহমাদ মাযহার, মিলা মাহফুজা প্রমুখ।]

জয় হোক আলো ঘরের, জয় হোক আলোকিত মানুষের
জয় হোক আলো ঘরের, জয় হোক আলোকিত মানুষের
শ্যামলী খান।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
মোখলেস হোসেন