কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো

কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো

মোহাইমিনুল হক জয়
ইংরেজি পঞ্জিকার তথ্য মতে শুরুটা ২০০৮ সাল। সেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে থাকা কিশোরের মাথায় বইয়ের পোকা ঢুকিয়ে দেয়া সংগঠনটির নাম বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সদস্য ছিলাম দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রমের স্কুল পর্যায়ের বইপড়া কর্মসূচিতে। রঙিন ফিতায় তৈরী বাক্সে বসে রমনার বটমূল থেকে বই পুরস্কার নিয়েছি গোটা পাঁচেক বার। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি । কলেজের নাম ঢাকা কলেজ। স্কুলে থাকাকালীন সময়ে আমার স্কুলে বইপড়া কর্মসূচির সংগঠক ছিলেন তারেক হাসান ভাই।
ওহ ! স্কুলের নাম তো বলা হলো না। আমি ঢাকা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। তারেক ভাইয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কলেজ কর্মসূচি সম্বন্ধে জানা। আমার কলেজে যেহেতু স্কুলের মতো বইপড়া কার্যক্রম নেই, সুতরাং কেন্দ্রীয় কলেজ কর্মসূচির সদস্য হলাম। সদস্য নম্বর ১০। শুধু আমি নই , ঢাকা শহরের বিভিন্ন কলেজ থেকে অনেকে এসেছে। প্রায় ১০০ জনেরও বেশী।
স্পষ্ট মনে আছে, কলেজ কর্মসূচির ২৯তম ব্যাচের উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালের ৮ই নভেম্বর ।

শুক্রবার সকালে তখন কোচিং থাকতো। সেই কোচিং ফাকি দিয়ে চলে গেলাম কেন্দ্রে। শুধু ঐ শুক্রবার নয়, প্রতি শুক্রবার-ই কোচিং এর কথা বলে কিংবা কোচিং ফাকি দিয়ে কেন্দ্রে চলে যেতাম।
প্রথমদিকে তো কাউকে চিনতাম না। তবে এই অচেনা হয়ে বেশী দিন থাকতে হয় নি।
কেন্দ্রে আমার প্রথম বন্ধুর নাম শাফায়েত , সরকারী বিজ্ঞান কলেজের ছাত্র। ওর সাথে সরকারী বিজ্ঞান কলেজের আরো গোটা পাঁচ-ছয় জন আছে। সবার সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব । আল-আমিনের সাথে পরিচয়টা কয়েক সপ্তাহ পরে। তারপর রঞ্জন, শ্রুতি, মেহেদি, আসিফ, সিলমী, দিপান্বিতা, সোয়াদী, লুবনা, মৌরি, প্রিয়ংবদা, ফাহিম, সাবিক, আবির আর কতো জন ! নাম বলতে শুরু করলে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জনের নাম বলতে পারব।

কলেজ কর্মসূচির প্রতিটা ব্যাচের একটা নাম থাকে। ব্যাচের সবার থেকে নাম নেয়া হলো। সর্বসিদ্ধান্তক্রমে ব্যাচের নাম দেয়া হলো উদ্ভট-২৯। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা আসলেই অনেক উদ্ভট ছিলাম।
আমাদের ব্যাচের সংগঠক ছিলেন কলেজ কর্মসূচির ২১তম ব্যাচের রবি ভাই এবং ২৭তম ব্যাচের মারিয়া আপু। রবি ভাইকে তখন যে পরিমাণ ভয় পেতাম, এখন ঠিক ততটা কিংবা তার থেকেও বেশী ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি।

২৯ তম ব্যাচের হয়ে কেন্দ্রের সাথে আমাদের প্রথম ভ্রমণ ছিল ২৫শে ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণ। ততদিনে কেন্দ্রে প্রায় ৬-৭ টি ক্লাস করলেও সবার সাথে ততটা সখ্যতা গড়ে ওঠেনি যতটা জাহাঙ্গীরনগর ভ্রমণের পরে হয়েছে। ভ্রমণেই পরিচিত হই কলেজ কর্মসূচির সিনিয়র ব্যাচের অনেকের সাথে। আমার জীবনে পরিবারের পরে সবচে’ বড়, আস্থা, নির্ভয়ে শ্বাস ফেলার যে জায়গা, সেটার নাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যার উপাদান এই সিনিয়রা কিংবা আমার ব্যাচের বন্ধুরা। বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই মেসবাহ সুমন ভাইকে। ওনার জন্য কেন্দ্রের স্মৃতিগুলো আরো রঙিন হয়েছে। ঢাকার বাইরে স্কুল পর্যায়ের বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কার বিতরণী উৎসব থেকে শুরু। সাংগঠনিক সম্পর্কের বাইরেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক এতোটা সুন্দর হতে পারে, তা হয়তবা আমার ধারণার গন্ডিতে ছিল না। হাসিঠাট্টা কিংবা কোন সিদ্ধান্তে দ্বিধায় থাকলে সবার প্রথম যে নামটা মনে আসে ,সেটা মেসবাহ সুমন ভাইয়া।

কেন্দ্রের প্রতি এতটাই ভালেবাসা কাজ করে যে শুক্রবার কবে আসবে সেই অপেক্ষায় মিনিট, সেকেন্ড গুনতাম। কবে দেখা হবে সবার সাথে। ক্লাস শেষ করে কেন্দ্রের ছাদে বসে আমরা আড্ডা দিতাম। গল্প করতে করতে হঠাৎ একদিন নাজমুল ছাদের নাম দিলো স্টুডিও জিরো। স্টুডিও জিরো দেবার কারণ ছিল আমরা ওখানে বসে অনেক কাল্পনিক জিনিস বানিয়ে ফেলতাম। অনেক কিছু চিন্তা করতাম। সেজন্য ছাদটাকে স্টুডিও বানিয়ে ফেললাম। আর জিরো ? ঐ যে সীমাহীন আকাশ। কেন্দ্রের সাথে সম্পর্কটা আরো গাঢ় হলো যখন স্কুলে-স্কুলে সংগঠক/সহকারী সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করলাম ; ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে লাগলাম। কেন্দ্রের সাথে সম্পর্কটা অনেক মধুর। হাসি-ঠাট্টা-কান্না সবকিছুর সাথে কিভাবে জানি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জড়িত। জীবনের প্রথম ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ বেদিতে ফুল দেয়ার স্মৃতিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে।

কেন্দ্রের সাথে সম্পর্কের পরে সবচে’ লক্ষণীয় পরিবর্তন আমার যেটা, তা হলো আমি কথা বলতে শিখেছি। আমি যেকোন বই পড়লে সেটার গল্পটা চোখের সামনে দেখতে পারি। প্রতিটি লাইনের প্রতিটি শব্দ যেন আমার কাছে বাস্তব মনে হয়।আগে যেখানে কিছু মানুষের সামনে কথা বলতে আমার হাটু কাপতো, আমি এখন সেখানে হাজার হাজার মানুষের সামনেও কথা বলতে পারি আত্মবিশ্বাসের সাথে। আমি ভিন্নভাবে দেখতে শিখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি মানুষের সাথে মিশতে শিখেছি। একজন সংগঠক হতে পেরেছি।
আর দশজনের সাথে আমার দৃষ্টিভঙ্গি, চাল-চলনের স্পষ্টত পার্থক্য দেখতে পাই। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আমার পথচলা প্রায় ১০ বছরেরও বেশী সময়ের। জীবনের পরতে পরতে একটা সংগঠনের এতটা প্রভাব পড়তে পারে, কেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত না হলে হয়তো বা বুঝতাম না; বিশ্বাসও করতাম না।
ঢাকা কলেজে পড়াকালীন সময়ে সবাই যখন ক্লাস না হলে কিংবা ক্লাস ফাকি দিয়ে ধানমন্ডি কিংবা কলেজের পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দিতো, আমি তখন বসে বসে বই পড়তাম, ডায়েরি লিখতাম। বই আমার তখন এতটাই আপন যে, পড়া শেষ হলেও আবার পড়তাম। সুন্দর সুন্দর রঙিন কালির কলম দিয়ে ডায়েরি লিখতাম।

তখন ডায়েরির গুরুত্ব অতটা না বুঝলেও এখন যখন অবচেতন মনে কিংবা অবসর সময়ে ডায়েরিটা দেখি, তখন যেন আমি সেই ২০১৩ সালে ফিরে যাই। সেই ক্লাস, সেই মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে।
সময়ের স্রোতে আজ অনেকের সাথে দেখা হয় না। প্রায় সবাই-ই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের চাপে ব্যস্ত। ঠিক মতো দেখা হয় না, আড্ডা হয় না। অনেকের সাথে তো কয়েক বছরেরও বেশী সময় দেখা হয় না। কিন্তু কলেজ পড়ুয়া সেই বন্ধুগুলোকে অনেক মনে পড়ে। আড্ডা-গল্প-গান সবই যেন জীবন্ত মনে হয় যখন ডায়েরিটা সামনে নিয়ে বসি। আমি যখন ২০১৩ সালে কলেজ কর্মসূচির সাথে যুক্ত হই , তার মাস খানেক পরে ৩৫ বছর পূর্তি উৎসব হয়। দেখতে দেখতে কিভাবে পাঁচ বছর কেটে গেল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এখন প্রস্তুতি নিচ্ছে ৪০ বছর পূর্তি উৎসবের।
বাহ ! সময় কতো দ্রুত চলে যায়।

একদিন হয়তবা কেন্দ্রের ৫০ বা ১০০ বছর পূর্তি হবে। তখন হয়তবা আরো ব্যস্ত হয়ে যাবো । এখনকার মতো ঘড়ি পকেটে রেখে আড্ডায় বসতে পারবো না; মা হয়তবা ফোন দিয়ে বাসায় আসার জন্য বকবে না । কলেজ কিংবা কোচিং ফাকি দিয়ে কেন্দ্রে আসতে হবে না। আজ যাদের সাথে ছোলা-মুড়ি চিবুতে চিবুতে চায়ের কাপে ঝড় তুলে গল্প করছি, কেন্দ্রের গলিকে নিজেদের অবস্থানের জানান দিচ্ছি, তখন হয়তবা এমনটি পারবো না ; মানুষগুলো হয়তবা থাকবে না। পুরাতন বিল্ডিং এ বসে মোর্তজা ভাইয়ের সাথে দুপুরে খাওয়া হবে না। মহুয়াতলায় বসে বিশ্রাম নেয়া হবে না। কিন্তু ডায়েরির পাতাগুলো যখন দেখব, তখনও কেন্দ্রের প্রত্যেকটি মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আমার কৈশোর রাঙানো দিনগুলো তো এখানেই রয়ে গেছে। সেগুলো ভুলি কি করে ?

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
মনে পড়ে সেই স্কুল কলেজের প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীর মুখ
মনে পড়ে সেই স্কুল কলেজের প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীর মুখ
পথিক শহিদুল
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
আল আমিন