নীরব বিপ্লবের সরব স্বীকৃতি

নীরব বিপ্লবের সরব স্বীকৃতি

জয়দীপ দে
২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জাভিক কর্মসূচির সংগঠক হিসেবে কাজ করতাম। ২০০৪ সালে স্যার ম্যাগসেসে পুরষ্কার পান। পুরষ্কার পাওয়ার খবর পেয়ে নিচের লেখাটি লিখেছিলাম। কৈশোরের আবেগে কিছু অতিরঞ্জন ও যুক্তিহীনতা থাকতে পারে। আশাকরি, ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ৪০ বছর পূর্তি উৎসব ব্লগের জন্য লেখাটিতে সমসাময়ীক কিছু তথ্য যুক্ত করে দিলাম।
১.
২০০৪ সাল। খবরটা ছিল পত্রিকার এককোণায়, আর দশটা পারিপার্শ্বিক সংবাদের সাথে। অথচ প্রথম পাতার সব খবরকে ছাপিয়ে উঠে আসছিল- সার্চ লাইটের কড়া আলোর মতো। একজন লোক মৃদুহাস্য বদনে তাকিয়ে আছেন, ভাবখানা এমন, সামনে কী-জানি-কী এক মজার কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, তার নীচে খবরটা। প্রথমে পড়েই ঠাণ্ডা মেরে গেলাম। কিছুক্ষণ স্থির থেকে- আবার পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটা উটকো ভাবনা আর চিত্রকল্প এসে বারবার আমাকে সমূলে উড়িয়ে দিচ্ছিল। হায়, এখন কী হবে? এতো বড়ো সমস্যার কথা! যে লোক সারাজীবন অন্যকে পুরস্কৃত করে গেলেন তিনি কী করে আজ উল্টো কাজটা করবেন? নাকি পুরস্কার নেয়ার অনুষ্ঠানে একটা ভজঘট বাঁধিয়ে বসেন।
খবরটা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, তথা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। এবার এশিয়ার নোবেল বলে পরিচিত ম্যাগসেসে পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন তিনি। রামোন ম্যাগসেসে কমিটির ভাষ্য মতে মৃত-প্রায় বাংলা সাহিত্য পাঠকের কাছে সমাদৃত করে তোলা’র জন্য তাকে এই মূল্যায়ন। আগামী ৩১ আগস্ট আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাতে ফিলিপাইনের মহামান্য রাষ্ট্রপতি গ্লোরিয়া অ্যারোইয়া এ পুরস্কার তুলে দেবেন। দেখা যাক তখন কী কাণ্ডটা ঘটে। গ্লোরিয়াকে তো হাই-স্কুলের ফুটফুটে কিশোরীর মতো দেখায়, স্যার যদি তাকে জাভিকের (জাতীয় ভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম) পুরস্কার বিজয়ী ভেবে উল্টো পুরস্কার এগিয়ে দেন- এ আশঙ্কা থেকে থেকে সন্ত্রস্ত করে তুলছিল।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর ম্যাগসেসে প্রাপ্তি নিয়ে আহ্লাদে আটখানা হওয়ার কিছু নেই। এই পুরস্কারটি এখন আর আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগে এদেশের আরো তিনজন প্রতিথযশা ব্যক্তি এই পুরস্কারটি পেয়েছেন, তারা হলেন- এ্যাঞ্জেলা গোমেজ, ফজলে হাসান আবেদ ও অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস।। তবে এদের সঙ্গে তুলনা করলে সায়ীদ স্যারের অবস্থানটা একটু ভিন্ন। এরা সবাই মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এধরণের কাজের ফলাফল ও পরিধি সহজেই নিরুপণ করা সম্ভব, এসব কাজের কিছু তাত্ত্বিক মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কেন জানি ওপথে পা বাড়ালেন না। তিনি মানুষের আর্থিকের পরিবর্তে আত্মিক উন্নয়নের পিছু ছুটলেন। এ ধরণের কাজের ফলাফল ও অগ্রগতি দুই-ই নিরুপণ করা দুঃসাধ্য। চটজলদি এর মাধ্যমে কিছু করে দেখানোও সম্ভব নয়, রীতিমতো কয়েক প্রজন্মের ব্যাপার। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয় সৈনিকদের ধরে রাখা তত কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম সায়ীদ স্যারের কাণ্ড কারখানা অনেকের কাছে পাগালামি- অনেকের কাছে হুজুগে মনে হয়েছিল, এখনও হতে পারে। কিন্তু এক সিকি শতাব্দী ধরে নিরবিচ্ছন্ন সাধানোর মাধ্যমে তিনি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। সম্পূর্ণ বায়বীয় এমন একটা ব্যাপার সঠিকভাবে অনুধাবন করাও সব লোকের দ্বারা সম্ভব নয়। ধন্যবাদ ম্যাগাসেসে কর্তৃপক্ষকে সঠিক মানুষকে বেছে নেয়ার জন্য। এই তো সেদিন এক লেখক এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে লিখলেন এ মুহূর্তে স্যারের এমন একটি স্বীকৃতির বড়ো প্রয়োজন ছিল। যুদ্ধ জয় না হোক, যুদ্ধ চলাকালে একটা ‘আয়রন ক্রস’ একজন যোদ্ধার জন্য কম বড়ো গর্বের ব্যাপার নয়।
স্যার প্রায়ই বলেন বাঙালি যেকোনো জিনিস শুরু করে সুন্দর, কিন্তু ধরে রাখতে পারেনা। তিনি বোধহয় বাঙালিকে সেই গ্লানির হাত থেকে রেহাই দিতে যাচ্ছেন।
২.
স্যার প্রায়ই একটা প্রশ্ন করেন, দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা কোনটি। অনেকে অনেক কিসিমের উত্তর দেয়। কেউ সন্ত্রাস, কেউ দুর্নীতি, কেউ জনসংখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তিনি বলেন অন্যকথা। তাঁর মতে দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে- মূল্যবোধের সংকট।
একটু গভীরে ভেবে দেখুন, আমাদের চারদিকে যত সমস্যা-মালা ছড়িয়ে, তা একটি বৃহৎ সমস্যার উপসর্গমাত্র। সমস্যাগুলোর গোড়া ঐ মূল-সমস্যার নাভিতে প্রোথিত। আর মূল সমস্যাটি আমাদের মানসিক, চেতনাগত। জাতি হিসেবে আমাদের নেই কোনো চারিত্রিক দৃঢ়তা। নেই সামষ্টিক কোনো কমিটমেন্ট। আমরা একেকজন একেকভাবে একেক ধান্ধায় ছুটছি। আমাদের চিন্তা-ভাবনা সব ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কোনো জাতীয় ইস্যুতে আমরা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারিনা। অনেকে এদেশের উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে সম্পদের অপ্রতুলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জনসংখ্যা বিস্ফোরণকে দায়ী করতে পারেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে এসব অজুহাত একেবারে অচল। আমাদের কিছু হলেও সম্পদ আছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে জাপানের তো তাও ছিল না, তার উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দগদগে ঘা- যখন তখন ভূমিকম্প, সব কিছুই তো অতিক্রম করে এসেছে জাপানের অপরাজেয় মানুষগুলো। জার্মানির কথা ধরুন, দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধে তারা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল, কই তারা তো মিলিয়ে যায়নি। আজ জার্মানি বিশাল এক অর্থনৈতিক শক্তি। জার্মানি আর জাপানের উদাহরণ টানলাম, কারণ জাতি হিসেবে এদের চারিত্রিক দৃঢ়তার মাত্রা অনেক উঁচুতে। এসব কিন্তু একদিনে হয়ে উঠেনি। প্রতিটি সমাজ একটি মূল্যবোধের উপর দাঁড়ায়। সেই ভিত্তির সঙ্গে মানুষকে যখন পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, মানুষটি তখন অজেয় হয়ে উঠে। সহজে সে ভেঙে পড়ে না, উড়ে যায় না। একটি জাতির মূল্যবোধ গড়ে উঠে তার যুগ-যুগ ধরে চলমান পদযাত্রার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আর এই অভিজ্ঞতার মূর্তমান রূপ হচ্ছে সে জাতির শিক্ষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস। কিন্তু এসবের সঙ্গে লোকে পরিচিত হবে কী করে? সেই কঠিন উত্তরটা খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নি সায়ীদ স্যারের। সহজ ও একমাত্র উত্তর হচ্ছে- বই। তাই তিনি বই নিয়েই নেমে পড়লেন রাস্তায়। আজ থেকে ৪০ বছর আগে মাত্র ১৫ জন সাহাবি নিয়ে। আজ সেই কাফেলায় লক্ষ লক্ষ প্রাণোচ্ছ¡ল তরুণ। যেন হ্যামিলিয়নের বাঁশিঅলা এদেরকে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক স্বপ্নের ভুবনে।
৩.
ঢাকার বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান কার্যালয়ে গেলে ফজলুল করিমের সেই কলি দুটি মনে পড়ে-কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহু দূর ...। ধোঁয়া-ধূলিতে ধূসরিত নগরীর বুকে নৈসর্গের লালিত্যমাখা একটা নিরিবিলি গৃহকোণ, আমাদের কল্পনার স্বর্গের খুব কাছাকাছি। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয় এখানকার মানুষগুলোর কাজ-কারবার দেখে। এতো ব্যাপক ও বিশাল কর্মকাণ্ড চলছে কত সুশৃঙ্খলভাবে! কর্মচাঞ্চল্য আছে, কিন্তু কোনো অস্থিরতা নেই- অনিয়ম নেই। নৈরাজ্যের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এই দেশে এক টুকরো সবুজ দ্বীপের মতো জেগে আছে এই অফিসটি। তৃতীয় বিশ্বে বসে জ্ঞানের যতগুলো শাখা স্পর্শ করা সম্ভব, সবই ধরে এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। রয়েছে প্রায় ২লাখ বইয়ের একটি সুসমৃদ্ধ পাঠাগার। ছোট অথচ চমৎকার একটি মিলনায়তন, যাতে হররোজ চলছে শ্রবণ-দর্শনের বিভিন্ন কার্যক্রম। কখনো ফিল্ম, কখনো গানের অনুষ্ঠান, কখনো বিশেষ বক্তৃত্বা, কখনোবা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স। কিন্তু এতো কার্যক্রম যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, সেই লোকটির জন্য কিন্তু একটা কক্ষতো দূরে থাক, একটা চেয়ার পর্যন্ত সংরক্ষণ করা নেই। আর দশটি অফিসের মতো এখানে বড়ো কর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পি.এ-র কাছে ধরণা দিতে হয় না, দাঁড়াতে হয়না লম্বা লাইনে। তিনি আর দশজনের মতো হাঁটছেন-ফিরছেন, কথা বলছেন, কাজ করছেন। এমনই নির্মোহ, নিরহংকার- এমনি ঋষিতুল্য ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
৪.
এদেশের বুদ্দিজীবীদের লোকে ভালো চোখে দেখে না। এদের প্রায় সবার গা থেকে রাজনীতির আঁশটে গন্ধ বেরোয়। তার উপর যেসব বুদ্ধিজীবী এনজিও-টেনজিও করে বেড়ান তারা তো পুরোদস্তুর রোষের উপরে। সায়ীদ স্যারের হাসি আর গোঁফের বিশেষ খ্যাতি আছে। অনেকে তার বুদ্ধিদীপ্ত হাসি আর প্রশ্নবিদ্ধ (হিটলারি) গোঁফ দেখে ভাবেন এ লোক না-জানি কত বড়ো ধূর্ত। এরা যখন জানতে পারে তিনি শুধু বুদ্ধিজীবীই নন, এনজিও করেন- তখন অনুমানটাকে মোটামুটি নিশ্চিতের পর্যায় নিয়ে যায়। কিন্তু লোকটার ব্যাপারে একটু খোঁজ-খবর নিলে প্রকৃত সত্যটি বেরিয়ে আসবে।
স্যারের একটি চমৎকার প্রবন্ধ আছে। আমাদের বাড়ি। অনেক শখ করে বিভিন্নজনের কাছে ধার-কর্জ করে তিনি একটি প্লট কিনেছিলেন উত্তরায়। সেখানে একটা বাড়িও করেছিলেন। তাঁর আর্কিটেক্ট ছাত্র উত্তম কুমার সাহা সেই বাড়িটার নকশা করে দেন। বড়ো চমৎকার সেই বাড়ি আর এর আশেপাশের পরিবেশ। পুরো প্রবন্ধে এরই বর্ণনা। প্রবন্ধটি পড়ে সাংঘাতিক মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। চট্টগ্রাম শহরের একপ্রান্তে আমাদের একটুকুরো জমি আছে। মনে মনে ভাবছিলাম স্যারের বাড়িটা দেখে ওরকম একটা বাড়ি বানাব সেখানে। এবার ঢাকা গেলে সোজা উত্তরা চলে যাব বাড়িটা দেখতে। ‘আমাদের বাড়ি’র শেষ অনুচ্ছেদটি পাঠকের উদ্দেশ্য নিবেদন করলাম।
আমি জানি, টাকা রোজগার আমাকে দিয়ে হবে না। এ পৃথিবীতে জীবন মাত্র একবার। টাকার পায়ে একে অশ্লীল উৎসর্গের কোনো মানে নেই। পাথেয়কে আমি তাচ্ছিল্য করে অপমান করেছি, তার প্রতিশোধ আমি এড়িয়ে যেতে পারব না। আজ হোক, কাল হোক, এই বাড়ি ক্রোক হয়ে যাবে। আমার চেয়ে অনেক বিত্তশালী কোনো মানুষ এসে কিনে নেবে আমাদের এই শব্দময় বাড়ি, যাকে দূর থেকে সোনালি মৌচাক বলে ভুল হয় আমার। সে কিনে নেবে দোতালার সব নিসর্গবেষ্টিত ঘর- এর হাওয়ায় ওড়া বেপরোয়া বারেন্দা, দোতালায় ওঠার প্রিয় কাঠের সিঁড়ি, পূর্ণিমা রাতের হত্যাকারীর মতো বিশাল গোল চাঁদ, সবকিছু। কিন্তু যে অলৌকিক রূপের জগৎকে প্রতি পলে আমি এখানে প্রত্যক্ষ করেছি, তা সে কোনোদিন কিনতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের স্বাক্ষর দেওয়া নোটের ক্রয়ক্ষমতার তা বাইরে।
আমাদের বাড়ির এই রূপের জগৎ যদি দেখতে চাও, আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাবার আগেই এখানে এসো। না হলে, পরে, আমার এসব বর্ণনা পড়ে তুমি এসে এখানকার বাসিন্দাদের কোনোদিন জিজ্ঞেস করো, এমন একটা জায়গা এখানে কোথায় আছে বলতে পারেন’- তখন তারা তোমার প্রশ্ন শুনে হয়তো প্রথম কিছুক্ষণ ভাববে, তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে আশেপাশের এলাকা হয়তো খুঁজে দেখতেও চেষ্টা করবে এক-আধটু, তারপর হতাশার স্বরে একসময় বলবে: আপনি কোন্ জায়গার কথা বলছেন ঠিক বুঝতে পারছি না তো। এ এলাকায় এমন কোনো জায়গার কথা তো কখনো শুনিনি।
যা কেবল আমার একলা ভালোবাসা আর স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তোলা তার ঠিকানা অন্য মানুষের তো জানা থাকবার কথা নয়।
স্যারের অনুমান ভুল হয়নি। তিনি এ প্রবন্ধ ১৯৯৫ সাল লিখেন। তার ঠিক দুবছর পর বাড়িটি নিলামে উঠে। যথারীতি তা অন্যের হাতে চলে যায়। এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি প্রায় বলেন, গানের পাখি কোকিলের কোনো বাসা থাকে না।
৫.
ফুটবল খেলায় একটা কথা প্রচলিত আছে- ছোট দলে বড়ো খেলোয়াড়। তেমনি আমাদের এই ছোট্ট দেশে বেশ কয়েকজন বড়ো মানুষ আছেন। তাঁরা মাথা তুললেই আমাদের উপস্থিতি বিশ্বের দরবারে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। তাঁরা কথা বললে আমাদের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত্ব হয়। এদেরই একজন সায়ীদ স্যার।
সায়ীদ স্যার সম্পর্কে একটা শোনা গল্প আছে। বিশ্বস্ত সূত্রে শোনা। একবার এক দুঁদে জেনারেল-কাম-প্রেসিডেন্ট তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার বড়ো শখ অধ্যাপক সাহেব যেন তাঁর মন্ত্রিপরিষদে যোগদেন। এর আগেও বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী তাঁর ডাক শুনে তুত্-তুরিয়ে গোয়াল ঘরে ঢুকেছিলেন। সায়ীদ স্যারের ব্যাপারেও ব্যতিক্রম হবে না, ধরেই নিয়েছিলেন জেনারেল সাব। কিন্তু স্যার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই প্রস্তাব। তিনি বললেন, রাজ্য শাসন ক্ষত্রিয়ের কাজ, আপনারাই করুণ। আমি ব্রাহ্মণ (যেহেতু তিনি শিক্ষক- ব্রহ্মাচার্য), আমাকে আমার পেশায় থাকতে দিন’। একটা লোকের কত বড়ো হিম্মত থাকলে এ জাতীয় কথা বলতে পারেন একবার ভেবে দেখুন। তাই বলে লোক দেখানো সততার ভান নেই তাঁর। তিনি অকপটে বলেন- বিশুদ্ধ সততা মানবিক নয়।
৬.
স্যার সারাক্ষণ বই বই করলেও তিনি কিন্তু একটি Bookish Generation- -এর পক্ষে নন। আর দশজন বুদ্ধিজীবিদের মতো গদিআঁটা চেয়ারে বসে তিনি কেবল বিবৃতি লিখেন না, বক্তৃতা ছাড়েন না। তাকে পাওয়া যায় মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গার বুকে, স্যুয়ারেজের বর্জ্যে দুষিত হয়ে উঠা গুলশান লেকের পাড়ে, আশুলিয়ায় মাটি ফেলে ভরাট নীচু জমির উপরে। ডেঙ্গু যখন মহামারির মতো ধেয়ে আসে তখন তিনি পরমাত্মীয়ের মতো লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঔষধ ছিটিয়ে আসেন, ময়লা পরিষ্কার করে দেন। একজন সত্যিকারের শিক্ষকের প্রতিকৃতি এই লোকটি। যাকে দেখে সমাজের অনেক কিছু শেখার আছে।
মিডিয়ার লোকেরা তাঁকে আলোর ফেরিঅলা বলে। অনেকে আবার বাতিঘর। পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতা খুললে দেখবেন বুদ্ধিজীবিদের সেই একই ঘ্যানঘ্যান- দেশটা গোল্লায় গেলো, এ দেশ দিয়ে কিস্সু হবে না। তখন নিজেকে বড়ো বিপন্ন মনে হয়। কিন্তু একমাত্র সায়ীদ স্যারই ব্যতিক্রম। অবিরাম তাঁর কলম দিয়ে নিঃসৃত হচ্ছে আশাজাগানিয়া সব বাণী। তিনি চলমান হানাহানি নৈরাজ্য দেখে যেন বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তিনি গল্পের সেই মানুষটি, যে কিনা দূরে একটুকরো আলো দেখে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকতে পারে মাঘের হুল-ফোটানো

৭.
স্যারের মূল শক্তিটি নিহিত তাঁর কল্পনায়। এতো বড় মাপের কল্পনাপ্রবণ লোক এ দেশে বিরল। তাঁর প্রতিটি কাজে কল্পনা ও দূরদর্শিতার অপূর্ব সহাবস্থান। কেন্দ্রের সঙ্গে যখন জড়িত ছিলাম তখন কেন্দ্রের প্রতিটি কাগজের টুকরো আমাকে মুগ্ধ করত। যারা জাভিক-এর কাজে জড়িত তারা ভালো বলতে পারবেন, সদস্য কার্ড থেকে শুরু করে মাসিক প্রতিবেদন প্রতিটি ডকুমেন্টে এতো সুন্দর করে তথ্য সাজানো যে কখনো কর্মীদের কী করব এই প্রশ্নটি করতে হয় না। আমি তো বলি কেন্দ্রের মেরুদণ্ডই হচ্ছে স্যারের কল্পনা শক্তি। এই শক্তি দিয়ে তিনি অবলীলায় দেখে ফেলতে পারেন অনাগত দিনের মানুষটি কেন্দ্রকে পরিচালনা করতে কী সমস্যার সম্মুখীন হবে, সে অনুসারে সমাধান ঠিক করে যান।
স্যারের কল্পনার শক্তিমত্তা অনুধাবন করার জন্য মোবাইল লাইব্রেরি গাড়িটার সামনে দাঁড়ালেই যথেষ্ট। একেকটা গাড়ি কম করে ৩০-৩৫টি স্পটে যায়। অর্থাৎ ৩০-৩৫টি লাইব্রেরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৪৬টি ছোট-বড় গাড়ি রয়েছে। কেন্দ্র অদূর ভবিষ্যতে সব জেলায় মোবাইল লাইব্রেরি নামাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
৮.
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে তাঁর দুর্লভ সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। চট্টগ্রামে প্রথম আমরা যখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র উৎসব করতে যাচ্ছিলাম তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করে বসেন। তিনি বাঙালির উৎসব আধিক্যতাকে ভালো চোখে দেখেন না। তাঁর মতে বাঙালি ধুমধাম করে ঈদ পালন করে, কিন্তু রোজা রাখে না। কিন্তু আমরা যখন গোঁ ধরলাম তিনি আর না করলেন না। অবশেষে উৎসবটি হলো। কিছু বিশৃঙ্খলতা ছাড়া পুরো অনুষ্ঠানটি হলো চমৎকার। কেউ বলল চট্টগ্রামের বুকে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সম্মিলন। কিন্তু স্যার নির্বিকার। শুধু বললেন, ভালো- আরো গোছানো হওয়া চাই। তাঁর কথা শুনে আমাদের যেন প্লীহা পুড়ে লাগল। পরের বার যখন উৎসব করতে যাব শুধু একটাই কথা মাথায় চক্কর দিতে লাগল- আরো গোছানো চাই। দ্বিতীয়বার উৎসবের শেষে জানতে চাইলাম, কেমন হলো স্যার? তিনি মৃদু হেসে বললেন, ভালো- বেশ ভালো। এই যে স্যারের মুখ থেকে বেশ কথাটা বের করা কত যে কঠিন, তা কেবল তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তারাই কলতে পারবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, চট্টগ্রামেই প্রথম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র উৎসব হয়। চট্টগ্রামের কনসেপ্ট পরবর্তীতে ঢাকায় প্রয়োগ করা হয়।
স্যার কোন মন্তব্যের ব্যাপারে এতোটাই চোখ-কান খাড়া। তাই বলে যোগ্যকে সম্মান দিতে বিন্দুমাত্র বাধে না তাঁর।
৯.
স্যারের একটা বিরাট স্বপ্ন ছিল। সারা দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা। ভবনটি হবে বারো তলা। এই ভবনটি প্রাণচঞ্চল থাকবে নানামুখী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। এখানে থাকবে ৮ লক্ষ বই সম্বলিত সুসমৃদ্ধ একটি পাঠাগার, একটি চিত্রশালা, একটি নাট্যমঞ্চ, শিশুকেন্দ্র, মিলনায়তন, বিশ্বসঙ্গীত কেন্দ্র, বিশ্বচলচ্চিত্রশালা, বইয়ের সুপার মার্কেট, অতিথিশালা, ক্যাফেটরিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। ২০০৭ সালে বাংলামটরে পুরাতন ভবনের স্থানে এই কমপ্লেক্সটি গড়ে উঠেছে, নয়তলা ভবন হয়েছে। সবটুকু না হলে ও স্যারের অনেকখানি স্বপ্নপূরণ হয়েছে।
১০.
কেন্দ্রের সঙ্গে যারা জড়িত তারা কেন্দ্রের কার্যক্রমকে নীরব বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করে। বই পড়ার মতো আপাত-নিরীহ একটি ক্রিয়ার সঙ্গে বিপ্লব শব্দটি জুড়িয়ে দেয়া অনেকের কাছে অত্যুক্তি মনে হতে পারে। এটা হয়ত অনেকে জানেন, যে সমুদ্রের গভীরতা যত বেশি তার গর্জন তত কম। কেন্দ্রের ব্যাপার অনেকটা তেমন-ই। সারা বাংলাদেশে ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে ১৪০০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রের বইপড়া কার্যক্রম আছে। স্বেচ্চাসেবক কর্মী সংখ্যা ১৫০০০-এর কম নয়। এতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি ছাত্র তার মন ও বয়স উপযোগী মোট ১০০টি বই পড়ার সুযোগ পায়। এ বইগুলোর মাধ্যমে বাংলাভাষা ও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো কিশোর-তরুণদের সামনে হাজির করা হয়। এতে যেমন কৃষণ চন্দরের গাদ্দার আছে, তেমনি টারজানের সেরা গল্প- তারাশঙ্করের সপ্তপদী কিংবা শরতের দত্তা শুধু পড়াই নয়, পাশাপাশি রয়েছে বছর শেষে পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ। বই পড়ে যেকোন ছাত্র প্রতিবছর বই পুরস্কার পেতে পারে। বই পড়ার পাশাপাশি থাকে বহুমুখী আনন্দময় সাংস্কৃতিক আয়োজন। যেমন- কুইজ প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রীতি বিতর্ক, দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ ইত্যাদি। এসব কার্যক্রমের মধ্যে যে কিশোরটি বেড়ে উঠে, সে বড়ো হয়ে আর যাই হোক, অমানুষ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে নির্লজ্জের মতো ঘুষের জন্য হাত পাতবে না, সশস্ত্র হয়ে ছুটবে না মানুষ হত্যা করতে, ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা খুলে বসবে না।
কেন্দ্রের তথ্য মতে, বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লক্ষ কিশোর-তরুণ এ কার্যক্রমে অংশ নেয়। তাহলে চিন্তা করে দেখুন, কত লক্ষ সম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। আর দশ-পনের বছর পর এর আসল সুফল পাওয়া যাবে, যখন এসব খুদে পড়ুয়ারা বড়ো হয়ে দেশের হাল ধরবে। তখনই বোঝা যাবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাফল্য। তখনি কেন্দ্রের নীরব বিপ্লবের সরব বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। লক্ষ লক্ষ সম্পন্ন মানুষের কর্মের মধ্য দিয়ে।
১১.
আজ গ্রামীণ ব্যাংক সারা দুনিয়া জুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। কেন্দ্র কিন্তু তা পারেনি। কারণ গ্রামীণ ব্যাংক যত চট্জলদি এর আউটপুট দেখাতে সম্ভব, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কেন্দ্র এমন একটা জটিল ও আপেক্ষিক (এবং তাত্ত্বিক) ব্যাপার নিয়ে কাজ করছে, যার ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এমন এক বায়বীয় বিষয়কে বিবেচনায় আনায় ম্যাগসেসে কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। আশাকরি ম্যাগসেসের সূত্র ধরে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তথা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সারা দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে উঠবে। এতে করে জ্ঞান বিস্তারের এক অভিনব পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে বিশ্ববাসী।
বই লেখার জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়ার প্রচলন থাকলেও বই পড়ানোর জন্য আছে বলে জানা নেই। হালহকিকত দেখে যা মনে হচ্ছে শিঘ্রী এর জন্যও পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ চালু হবে। নিঃসন্দেহে প্রথম প্রাইজটা পেতে যাচ্ছেন সায়ীদ স্যার।
প্রতিটি পুরস্কার মানুষকে তারণ্যে ফিরিয়ে নেয়। চিরতরুণ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বারংবার তারণ্য প্রাপ্ত হোন। অভিনন্দন আচার্য্যকে, অভিনন্দন তাঁর হাজার হাজার স্বপ্ন-সারথিদের। আলোয় ভূবন ভরে উঠুক। চিরঞ্জীব হোক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।

জয়দীপ দে শাপলু
সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা
প্রাক্তন কর্মি, চট্টগ্রাম শাখা।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
মোখলেস হোসেন
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
আল আমিন