সবচেয়ে ভালোর জন্য যাহার সাধনা

সবচেয়ে ভালোর জন্য যাহার সাধনা

আলেক্স আলীম
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কলেজে ভর্তির সময় সমাগত তখন পড়ায় ব্যস্ত ছিলাম বিশ্বসাহিত্যের সেরা সেরা বইগুলো নিয়ে। খুব মজে গিয়েছিলাম জুলভার্ন আর আব্দুল্লাহ আল মুতির লেখায়। শেষটায় এসে রবীন্দ্রনাথই বেশি কাছে টানলো। সময়টা ছিল ১৯৭৯। তখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির জন্য কোচিং সেন্টারে বন্দী হতে হতো না। বাবা-মা'র শাসন কিছুটা শিথিল হতো। যে যে যার যার মতো জীবনটাকে উপভোগ করতো। আমি উপভোগ করছিলাম বইয়ের পোকা হয়ে।
আমার শৈশবে বড় ভাই আবদুল মান্নান (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটিতে আসার সময় আমার জন্যে মজাদার সব বই নিয়ে আসতেন। সেই থেকে বই পড়ার অভ্যাস হয়ে গেলো। পড়তাম আর ডায়েরিতে বইয়ের পছন্দের অংশটুকু লিখে রাখতাম।
একদিন পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি খুব ভালো লেগে গেলো। সেটি ছিল- সবচেয়ে ভালোর জন্য যাহার সাধনা তাহাকে অনেক ভালোই ত্যাগ করিতে হয়। এটি যেন আমার জীবনের ব্রত হয়ে গেলো। জীবনে অনেক ভালো কিছু এলো। অনেক প্রলোভন ছিল। আবার অনেক ভালোই আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আমি মাটি কামড়ে পড়ে থাকলাম সবচেয়ে ভালোর সাধনায়।
ছাত্র জীবনের বড় অংশই কেটেছে রাজপথে সাম্যবাদের স্বপ্নে বিভোর হয়ে। এক সময় ভাঙ্নের ধ্বংসস্তুপ স্বপ্নকে তচনচ করে দিলো। শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নিলাম। মনে হলো, এই পেশার মাধ্যমে স্বপ্নকে যেমন লালন করা যায় তেমনি নিজের স্বপ্নকে অন্যের মধ্যে সঞ্চার করা যায়। এক সময় বইপড়া আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তি আমার জীবন আদর্শ হয়ে গেলেন।

১৯৯৭ সালের শেষের দিকে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফুলকির অধ্যক্ষ শীলা মোমেনের সাথে দেখা হলো। উনি আমাদের প্রিয় শীলাদি। শীলাদি বললেন, তোমাকে একটি কাজ দিতে চাই তুমি একদিন আমার স্কুলে আসবে? অনেক কোতুহল নিয়ে বললাম অবশ্যই যাবো শীলাদি। শীলাদি ক'দিন পর টিএন্ডটিতে ফোন করে আমাকে আর সুমিকে ফুলকিতে ডাকলেন। আমরা দুজন গেলাম। গিয়ে দেখি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। এই প্রথম স্বপ্নের একজন মানুষকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। শীলাদি স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে কেন্দ্রের দায়িত্ব আমাদের হাতে তুলে দিলেন। সেই থেকে কেন্দ্রের সাথে পথচলা শুরু। বুঝে পেলাম ছয়টি স্কুলের দায়িত্ব। তখন জাভিক কর্মসূচি শেষ মূল্যায়ন পর্বের পর স্কুলে স্কুলে পুরস্কার দেয়া হতো। ২০০০ সালের শেষের দিকে সায়ীদ স্যারকে বললাম স্যার আমরা উৎসব করে সব স্কুলের পুরস্কার একসাথে দিতে চাই। স্যার প্রথম দিকে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে রাজি করানো গেলো। অনুষ্ঠানের রেকিট বেংকিজারের স্পনসর পেয়ে গেলাম। মুসলিম হল ভাড়া করা হলো। উদ্বোধন হবে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঢোলবাদক বিনয়বাঁশির ঢোলে। সকালে থাকবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আর চিত্রাঙ্কন বিষয়ক কর্মশালা। বিকেলে র‌্যালি আর পুরস্কার বিতরণ। আয়োজনকে বর্ণাঢ্য করে তুললো নামমাত্র খরচে জয়দীপ দে শাপলু। ঢাকা থেকে এলেন সায়ীদ স্যার আর মুস্তফা মনোয়ার স্যার। দিনটি ছিল ২০০১ সালের ১০ এপ্রিল (সম্ভবত)। সকাল হতেই মুসলিম হলের ভেতর-বাহিরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এত বড় অনুষ্ঠান সামাল দেয়ার মতো তখন আমাদের কর্মী বাহিনী গড়ে উঠেনি। মেসবাহ্ সুমন রীতিমতো যুদ্ধে নেমে গেলেন। ঢাকা থেকে আর কে কে এসছিলেন মনে পড়ছে না। সম্ভত মনির ভাই আর কামাল ছিলেন। ঐ সময় চট্টগ্রামে কেন্দ্রেকে গড়ে তোলার কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে ছিলেন মেসবাহ্ উদ্দিন আহমেদ সুমন। অনুষ্ঠানে কিছু কিছু অব্যবস্থাপনা দেখে স্যার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। পরের বছর আর সাহস করে বলতে পারলাম না স্যার উৎসব করে পুরস্কার দেবো। আবার স্কুলে স্কুলে পুরস্কার দেয়ায় সময়ে ফিরে গেলাম। এতদিনে স্যারের মাথা নিশ্চয় ঠান্ডা হয়েছে। সেই চিন্তায় মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অনেকগুলো স্কুল। স্যারের সাথে তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে মিটিং করিয়ে দিলাম। সিটি কর্পোরেশনের অধিকাংশ স্কুল আমাদের কেন্দ্রের কর্মসূচির আওতায় চলে এলো। ২০০৪ সালে আবারও উৎসব। এবার মিউনিসিপ্যাল স্কুল মাঠে। মাঠজুড়ে বিশাল প্যান্ডেল হবে। সাংবাদিক রফিকুল বাহার আর আমি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে আবদার নিয়ে গেলাম। উনি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন। দিনব্যাপী হলো চমৎকার উৎসব। উৎসব উপলক্ষে বের হলো প্রকাশনা খোলা হাওয়া। স্যার তাঁর লেখায় লিখলেন- চট্টগ্রামে কেন্দ্রের পালে হাওয়া লেগেছে। আগেরবার স্যারের গালিতে চ্যাপ্টা হয়েছিলাম আর এবার পালের হাওয়া চলার গতি বাড়িয়ে দিলো।
শুধু কি তাই! স্যার সিদ্ধান্ত নিলেন চট্টগ্রামের আদলে ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গাও পুরস্কার বিতরণী উৎসব হবে।
এখন তাই হচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রামে কেন্দ্র এখন অনেক পরিণত। ছয়টি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন সেই সংখ্যা তিন অংকের ঘরে। সহযোগিতার হাত বাড়াতে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও কার্পণ্য করেননি। নিয়মিত তিনি কেন্দ্রের খোঁজ রাখেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কার্যালয় দেবেন বলে। একদিকে সিটি করপোরেশনের স্কুলসমূহে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ। অন্যদিকে মহানগরীর স্কুলগুলোতে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রী।

কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর প্রায় অর্ধেক সময় আমি কেন্দ্রের সাথে কাটাতে পেরেছি এটি আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনা।
আমার পরিবারের বাকি অংশ ঢাকায় অবস্থান করলে আমি চট্টগ্রামে পড়ে আছি শুধু কেন্দ্রের আকর্ষণে। সেই যে মাথায় একবার ঢুকেছিল সবচেয়ে ভালোর জন্য যাহার সাধনা......।

সেই সাধনা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত
করে যেতে চাই।
সায়ীদ স্যারের সাথেই আছি
ফুল ফুটানোর জন্য
চারিদিকে আলোর ছটা
পালিয়ে বেড়ায় বন্য।
ধন্য আমি ধন্য।
কাজের সাথে বাড়ে সবই
হাওয়া লাগে পালে।
যাত্রা শুরু করেছিলাম
সাতানব্বই সালে।
আরো যাবো সামনে আমি
দেশও যাবে সাথে।
মেসবাহ্ সুমন মনির পরশ
হাত রেখেছি হাতে।

অধ্যাপক আলেক্স আলীম
সংগঠক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
মোখলেস হোসেন
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
আল আমিন