জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প

জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প

মোখলেস হোসেন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চল্লিশ বছর। প্রতিদিন ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে এই নিয়ে কতো কথা! রিটন ভাই, কাউসার ভাইদের মতো হেভিওয়েটরা তো লিখছেনই; ব্যান্টম ওয়েট, মিডল ওয়েট, এমনকি সদ্য গোঁফ গজানো কিংবা এই সেদিন পার্লারে গিয়ে প্রথমবার ভ্রু তুলে আসা ফেদার ওয়েটদেরও লেখার কমতি দেখছি না কোনো। এটাই স্বাভাবিক। কেন্দ্র আমাদের সবার। তবে ফেদারওয়েটদের দাবীটা যেন একটু বেশিই। কারণ যে আমি বুঝিনা তা নয়। বুঝি বলেই ঈর্ষা করি এদের।

দীর্ঘদিন কেন্দ্রীভূত পৃথিবীর বাইরে অবস্থান করার কারণে বড় বিচ্ছিন্ন লাগে আজকাল। ঠিক বুঝতে পারিনা চেনা পৃথিবীটা উল্টে গিয়েছে নাকি আমিই ভেসে বেড়াচ্ছি টিভির পর্দায় দেখা নভোচারীদের মতো হেট মুণ্ডু ঊর্ধ্বপদ হয়ে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে তো একটা জিনিস আছে, তাইনা? সে শাস্ত্র মতে ওজন আর ভর এক নয়।

তাই কেন্দ্রের আকর্ষণের বাইরে অবস্থান করলেও, আমার সত্ত্বায় কেন্দ্রের উপস্থিতি ঠিক ঠিক অনুভব করি। সুধীন্দ্রনাথ যেমন লিখে গিয়েছেন-

স্মৃতিপিপিলিকা তাই পুঞ্জিত করে
অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা ;
সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে
আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিবো না।

কারণের তো আর অভাব নেই। তবে কিনা আমার মতো কারণ আলা আরও অনেকেই রয়েছেন, সংখ্যায় দু তিন লাখের বেশি বই কম নয়। তাহলে আমি আলাদা হলুম কেমন করে! কোন ভরসায় লিখতে এলুম মম আলেখ্য?
আমার মতো আর কাউকেই যে কেন্দ্রের কারণে উদ্যত রিভলভারের সামনে দাঁড়াতে হয়নি!
একটু বেশি বেশি বলা হয়ে গেলো। রিভলভারের লক্ষ্য কেবল আমি একা ছিলাম না। আমার দুই বন্ধু, বিপ্লব মোস্তাফিজ আর গোলাম মোর্তজাও সেই ভয়ংকর দুপুরের সাক্ষী।
আমরা তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে পৃথিবী উদ্ধার করে বেড়াচ্ছি। অর্থাৎ ঘুরে বেড়াচ্ছি সারা বাংলাদেশ। যেখানে যেখানে কেন্দ্রের কর্মসূচি রয়েছে, বলতে গেলে তার কোনটিই রক্ষা পায়নি আমাদের হাত থেকে।

সেবার গিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গে। এই মিনিট খানেক আগেও মনে ছিলো জায়গাটার নাম, কিন্তু কী আশ্চর্য, টাইপ করতে গিয়ে কিছুতেই আর মনে পড়ছে না! উনিশ ’শ বিরানব্বই কি আর আজকের কথা!
খুব সম্ভবত নীলফামারী। তবে গাইবান্ধা কিংবা জয়পুরহাট হলেও হতে পারে। যদিও নওগাঁ হওয়াটাই ছিলো বাঞ্ছনীয়। কেননা জাহিদ আনোয়ার তো নওগাঁরই সংগঠক ছিলেন। আহারে, ছিলেন লিখতে গিয়ে বুকটা আমার ভেঙে যাচ্ছে। সমুদ্রের মতো বিশাল হৃদয়ের মানুষটা আর বেঁচে নেই। সে দুঃখের কথা এখন থাক। আজ অন্য গল্প।
জাহিদ ভাই আমাদের থাকার ব্যাবস্থা করে দিয়ে চলে গিয়েছেন সে অনেকক্ষণ। এমনিতেই অন্ধকার, তার উপর হেমন্তের মাঝামাঝি। ছোট্ট শহরটার সবাই তখন দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে। আমি, বিপ্লব, আর মোর্তজা তালাবন্ধ একটা দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছি। আলোচনার বিষয়, রোমেল যাকে তীব্র ভালোবাসে সে তারে আদৌ ভালো পায় কিনা!

এমন সময় উল্টো দিক থেকে শিস দিতে দিতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন তরুণ। সন্দেহের চোখে তাকালেন একবার। কে আপনারা, কোথা থেকে এসেছেন, কী চান, এতো রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন…………প্রশ্নের তোড়ে খাবি খেতে খেতে মোর্তজা কোনমতে বলতে পারলো আমরা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে এসেছি, সায়ীদ স্যারের ছাত্র।
সেই তরুণের নাম বলছি না। কে জানে, এখন হয়তো মস্ত বড় কেউ হয়ে বসে রয়েছেন দশ ও দেশের মাথায়। ধরে যাক তাঁর নাম টেনিদা।

আমরা চারমূর্তি অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। টেনিদা ছাত্র রাজনীতি করেন। কিছুদিনের জন্য ঢাকা ছেড়ে এখানে থাকতে এসেছেন। কী নাকি এক ঝামেলা হয়েছে ঢাকায়। তবে চিন্তার কিছু নেই, কদিন পরেই ম্যানেজ হয়ে যাবে। বললেন এই শহরটা তাঁর, কোথাও কোন অসুবিধায় পড়লে টেনিদার নাম বললেই হবে। পরদিন দুপুরে তাঁর সাথে খাবার দাওয়াত দিয়ে বিদায় নিলেন টেনিদা।
সকাল বেলা জাহিদ ভাই আসতেই টেনিদার কথা বললাম। তাঁকে বেশ চিন্তিত দেখালো। আমাদের তাড়া থাকায় এই নিয়ে খুব একটা আর কথা হয়নি। কাজ টাজ সেরে শহরের একটা রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছি আমরা। খিদেটাও বেশ চাগিয়ে উঠেছে। আধাআধি খাওয়া হয়েছি কি হয় নি, একটা গলা খাঁকারি শুনে চোখ তুলে চেয়ে দেখি সামনে রক্তচক্ষু নিয়ে টেনিদা দাঁড়িয়ে।

“আপনাদের না আমার সাথে খাওয়ার কথা?”

জাহিদ ভাই কাঁচুমাচু হয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েছিলান, কিন্তু টেনিদার চাহনি দেখে সেকথা গিলে ফেলে ডাল দিয়ে ভাত মাখাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন।
আমি, বিপ্লব, নাকি মোর্তজা? মনে পড়ছে না ঠিক। কেউ একজন বললাম,
“সে কী করে হয় টেনিদা? আমাদের খাই খরচার টাকা তো স্যার বরাদ্দ করে দিয়েছেন!”
টেনিদা কোন কথা না বলে কোমর থেকে একটা রিভলভার বের করে একে একে আমাদের তিনজনের দিকে ঘুরিয়ে ঠাণ্ডা হিমহিমে গলায় বললেন,
“বেশি কথা বলে একদম ফুটো করে দেবো। আপনারা সায়ীদ স্যারের ছাত্র। আপনাদের একবেলা খাওয়াতে পারা মানে আমি স্যারের জন্য, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্য কিছু একটা করলাম। ম্যানেজার, আমার জন্য একটা প্লেট লাগাও।”

শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ,

স্যার, আপনি কেমন করে পারেন? যে মানুষটা আপনাকে সামনে থেকে দেখেনি, সুরঞ্জনায় কি আমতলায়, ছাঁদে অথবা মিউজিক লাইব্রেরিতে বসে আপনার অপূর্ব সেইসব বক্তৃতা শোনেনি; যে লোকটা পালিয়ে বেড়াচ্ছে ঢাকা থেকে অনেক দূরের একটা মফঃস্বল শহরে, যে বই পড়ে না, যার কাছে গানের অর্থ নাইন এম এম…………আপনি কেমন করে পারেন সেই মানুষটাকে এমন করে অনুপ্রাণিত করতে?

আপনি যে স্বপ্নের সন্ধান আমাকে দিয়েছিলেন তাঁর ধারে কাছে আমি পৌছুতে পারিনি। কিন্তু স্বপ্নটার পেছনে এখনও যে ছুটে চলেছি এতেই আমি আপ্লুত।
আপনার স্বপ্নের ভবনটা আমার দেখা হয়নি। কিন্তু সে ভবন কেমন আমি জানি। অনেক রাতে, বাংলা মোটর থেকে উত্তরা ফিরতে ফিরতে, আপনি মাঝে মাঝে আপনার সেই টয়োটা পাবলিকা গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে বলতেন, যাদের এতো তাড়া তারা বরং আগে চলে যাক। রাস্তা খালি হয়ে এলে, সেই রাস্তায় ঢিমে তালে চলতে চলতে ভবনটার কথা বলতেন আপনি। কোন দিন আপনার পাশের সিটটায় আমি, কোন দিন জয়া আপা, কখনো সায়েমা। ওরা সবাই দেখেছে, কেবল আমারই দেখা হয়নি সেই ভবন।
ভালো থাকবেন স্যার। অনেকদিন আপনাকে দেখিনা


ইতি,
মোখলেস হোসেন
সদস্য, কলেজ কর্মসূচি
১৯৮৯ - আজীবন
(কচি আঁতেল ব্যাচ)

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
মোখলেস হোসেন
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
আল আমিন