বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন

 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন

মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল

না বাবার দিক থেকে কেউ, না মায়ের দিক থেকে কেউ- আত্মীয়স্বজন কেউ কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি আমার। কিন্তু আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সাধ ছিল। অক্ষর জ্ঞান আর্দশলিপিতে, তা পোক্তা হয়েছিল, রিক্সায় চলার পথে দোকানের বিলবোর্ড পড়তে পড়তে। পড়ার খেলা শুরুটা করেছিলেন মা। বলেছিলেন, দেখা যাক তুমি পড়তে পারো কি না ? না, বিলবোর্ড চলে যায়। সেই থেকে শুরু দ্রুতপঠন। নিজের সহপাঠ, বড় ভাইবোনের সহপাঠ, মুদি দোকানের ঠোঙা- আমি সবই পড়তাম । বইপত্রে যা নাম পেতাম সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। কেউ শিক্ষক, কেউ ছাত্র ছিলেন। সেসব দেখে সাধ হয় আমিও পড়বো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ছিলেন ড. গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব যার নিচ তলা অফিস রুম থেকে তৃতীয় তলার ক্লাসে যেতে সময় লেগে যেত ঘন্টার পর ঘন্টা। এতোই ছেলেমানুষ, আত্মভোলা। ছিলেন মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, আনোয়ার পাশা কিভাবে কিভাবে যেন তার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ পড়ে ফেলেছি। এইসব মানুষেরা হেটে বেড়িয়েছেন যেখানে, সেখানে পড়তে হবে। তখনও জানি না বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির নিয়মকানুন। ভালো ছাত্রের নাম পেয়েছিলাম, বিজ্ঞান নেয়া অবধারিত ছিল। এসএসসি এইচএসসির পর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার সুযোগ হলেও আমি অপেক্ষায় ছিলাম বিভাগ পরিবর্তন করে কলা বিভাগে পড়তে। আমার মা মানবিক বিভাগের প্রবেশপত্র দেখে ছিড়ে ফেলেন, বললেন সারাজীবন প্রাক্টিকাল করলে এখন এগুলোতে পড়ার জন্য। আমার তখন বিজ্ঞান বিভাগে পড়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকলো না। আমি আমার স্বপ্নের বিদ্যায়তনে পড়ার সুযোগ পেলেও পেলাম আরাধ্য বিভাগে পড়তে। মনে মনে ভেবেছি বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্র। আমি বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাস করবো। এসে দেখি আমার পরিসংখ্যান বিভাগের ক্লাস চলে চারটা পাঁচটা পর্যন্ত আর তার আগেই কলা ভবনের ক্লাস শেষ হয়ে যায়। আর আমার সকল না জানা অজানায় থেকে যায়। বই পড়ার অভ্যাসটা ছিল। ক্লাস না করার দুঃখ মেটাতে চেষ্টা করতাম ওই বিষয়ের বই পড়ে। বিক্রয় কেন্দ্র থেকে সিলেবাস কিনে বইয়ের নাম টাম জানার চেষ্টা করতাম। খুব একটা যুধংদেহি ব্যাপার চালিয়ে যাচ্ছি আমি বাস্তবতা আর আমার আকাক্ষার সাথে। এমন সময় আমি একটি বিজ্ঞাপন দেখি কার্জন হলের এক দেয়ালে। আলোর ইশকুল। এখানে অনেকগুলো চক্রের উল্লেখ আছে। বিশ্বসাহিত্য পাঠচক্র, গাছ ফুল ও নিসর্গ পরিচিতি, বাংলার ইতিহাস, চলচ্চিত্র চক্র, আবৃত্তি চক্র, দর্শন চক্র, প্রামাণ্য চিত্র চক্র, নাট্য পাঠচক্র, ইতিহাস চক্র, মুক্ত আলোচনা এরকম আরো কয়েকটি। আমি তখন দর্শনের বই পড়ছিলাম। আমি দর্শন চক্রের প্রতি আগ্রহী হলাম। ভাইভার দিন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অপ্রত্যাশিতভাবে ভাইভা রুমে প্রবেশ করেন। আমি কেবল বসেছি আর উনিও একটি ক্লাস নিয়ে কি মনে ভাইভা রুমে এলেন। আদতে তার কাছে সাক্ষাৎকার দিতে হতো দ্বিতীয় ধাপে। আসার পর উনি আমাকে বসতে বলে ভাইভা উনিই নিতে শুরু করলেন। আগ্রহের বিষয় বই পড়া জেনে উনি জিজ্ঞেস করলেন, কি কি বই পড়েছি। কাদের লেখা ভালো লাগে। ছোট ছোট কথার পর আমাদের দুজনের কথা শুরু হলো একটি বইকে নিয়ে। ‘গোরা’। নেড়েচেড়ে বিভিন্ন দিক থেকে। সময় কিভাবে চলে গেছে তা স্যার বুঝেছিলেন কি না তা আমি জানি না, তবে আমি টেরই পাইনি। শেষে মনে পড়ে আমার কথা একটু নিমরাজির মতো মেনে নিয়ে বলেছিলেন উপস্থিতিদের এদের প্রয়োজন পাঠচক্রে। ও কিসে ভর্তি হতে চায়? অন্যরা ফর্ম দেখে বললেন, দর্শন চক্রে। স্যার বলেছিলেন, কেন? ও সবই করবে। আমার দিকে ফিরে খুব ধীরে আন্তরিকতার সাথে বলেছিলেন, আমাদের এখানে শুধু দর্শনের উপর বক্তৃতা হবে, বই টই দেব না
বিশ্বসাহিত্য পাঠচক্র নামের কোর্সে আমরা বই দিই। পড়ে আসতে হয়। আর যেমন আলোচনা করলাম তেমন আলোচনা হয়। সেখানে তোমার মতো আরো অনেকে থাকবে। ভর্তি হয়ে যাও। কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল। আমি তাহলে দর্শন চক্রে ভর্তি হতে পারবো? স্যার, হেসে বলেছিলেন, হ্যা তুমি সব কিছুতে থাকবে। অনন্য সব কোর্স অনন্য সব শিক্ষকদের ততত্ত্বাবধানে। বিশ্বসাহিত্য, মহাকাব্য, বিশ্ব ইতিহাস, পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত, ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত, পাশ্চাত্য দর্শন, ভারতীয় দর্শন, মানভ সভ্যতার ক্রমবিকাশ, বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ, গাছ ফুল ও নিসর্গ পরিচিতি, আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র আর শত শত মুক্তোর মতো মুক্ত আলোচনা। গত পাচ বছরের শুক্র আর শনিবারের দিনগুলি আমার আলোর ইশকুলের ক্লাসগুলোতেই ব্যয় হয়েছে। বলা ভালো, সদব্যবহার হয়েছে। জানা আর শেখার পাশাপাশি হয়েছে পরিচয় এক বৃহৎ পরিবারের সাথে। তারপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা। বই পড়াকে সবার কাছে পৌছে দিতে চলছে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ আমি তার একজন ক্ষুদ্র হলেও একটি অংশ হয়ে পেরে নিজেকে কৃতজ্ঞ হিসেবে চিনতে পারি। কারন এই বিশ্বসাহিত্য এবং প্রেরণার বাতিঘর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কাছ থেকে নিয়েছি হৃদয় ভরে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেয় না, নেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শিখতে শেখায়, জানতে শেখায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্বপ্ন নিয়ে যে তৃষ্ণা নিয়ে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম তা আমাকে দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাই আমার কাছে যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়তনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু।

লেখক- বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবক।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চল্লিশ বছরের পথচলা
শুভ কিবরিয়া
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
স্মৃতির শ্যাওলাজমা দেড়তলা সাইজের দোতলা সেই বাড়িটা
লুৎফর রহমান রিটন
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
কেন্দ্রের চল্লিশ আর আমার এগারো
মোহাইমিনুল হক জয়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র; প্রগতির চেতনায় আলোকিত বিদ্যাপীঠ।
রাজন দত্ত মজুমদার
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
জীবনের ভরকেন্দ্র : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
আবদুল্লাহ আল মোহন
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
অংশুকারাভানের এক যাত্রী
নাদিয়া জেসমিন রহমান
 বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র , এক অনন্য বিদ্যায়তন
মোঃ এনাম-উজ-জামান বিপুল
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
বিশ্ব বন্ধু বর্মন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বারান্দায়
পিয়াস মজিদ
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
পূর্তি উৎসব মানেই অনেক আনন্দ! অনেক ব্যস্ততা!!
মোঃ মনির হোসেন টিটো
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে আলো হয়ে মিশে আছে শত শত মানুষ
ইশরাক পারভীন খুশি
“Kendro”, The Centre
“Kendro”, The Centre
MD. MAHDIUL HAQUE
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
জ্ঞান পিপাসু এক “গান” তাপসের গল্প
মোখলেস হোসেন
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
কেন্দ্রে চল, নতুন বই দিবো
আল আমিন